কক্সবাজার ভোর ৫:২৩ ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১ | ১৪ আশ্বিন, ১৪২৮

নির্মাণাধীন দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথে বাঁধের কারণে বন্যা

হিমছড়ি ডেস্কঃ 

চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত নির্মাণকাজ চলছে ১০০ কিলোমিটার রেলপথের। এর প্রায় ২৫ কিলোমিটার অংশ পড়েছে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায়। রেলপথের মধ্যে এই অঞ্চল তুলনামূলকভাবে অনেক নিচু। ফলে কিছু জায়গায় মাটি থেকে ২০ ফুট উঁচুতে রেলপথের জন্য বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। কয়েক দিনের টানা ভারি বর্ষণ ও পার্বত্য অববাহিকার মাতামুহুরী নদীতে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে পানিবন্দি এই উপজেলার ১৮টি ইউনিয়নের সাত লক্ষাধিক মানুষ। সেই বাঁধের কারণে চকরিয়ায় বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। তবে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নির্মাণাধীন রেলপথ বন্যার একমাত্র কারণ নয়, যদিও এই রেলপথের নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার পর তিন বছরে দুইবার ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছে এই অঞ্চলের মানুষ।

দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু থেকে মিয়ানমারের কাছে ঘুনধুম পর্যন্ত সিঙ্গল লাইন ডুয়াল গেজ ট্যাক নির্মাণ বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের চকরিয়া অংশ সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, বাঁধের দুই পাশ বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়ে আছে। বর্ষার আগেই ভারি বর্ষণে তলিয়ে গেছে বাঁধের কাছাকাছি থাকা কালভার্ট ও জলাশয়গুলো। দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠও পানির নিচে। বাঁধকে কেন্দ্র করে আশপাশের লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছে। বাঁধের পশ্চিম পাশের তুলনায় পূর্ব পাশে কয়েক ফুট বেশি পানি জমে আছে। পানি নেমে যাওয়ার জন্য এলাকাভিত্তিক পর্যাপ্ত কালভার্ট না থাকায় এই পানি ভাটির দিকে নামতে পারছে না। রেলপথের বাঁধের কারণে উপজেলার হারবাং, বরইতলী, কোনাখালী, ঢেমুশিয়া, পূর্ব বড় ভেওলা, পশ্চিম বড় ভেওলা, বিএমচর, সাহারবিল, চিরিঙ্গা, ফাঁসিয়াখালী, ডুলাহাজারা ও খুটাখালী ইউনিয়নের মানুষের ভোগান্তি বেশি হচ্ছে।
চিরিঙ্গা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি জামাল হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘আমার ইউনিয়নে এর আগে কখনো এমন বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। এক দিনের ভারি বর্ষণে ইউনিয়নের তিনটি ওয়ার্ডের মানুষ ভয়াবহ জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে। নির্মাণাধীন রেললাইনের সঙ্গে এলাকাভিত্তিক প্রয়োজনীয় ছোট ছোট কালভার্ট নির্মিত না হওয়ায় পানি যাওয়ার পথগুলো বন্ধ হয়ে গেছে।’

পশ্চিম বড় ভেওলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বাবলা বলেন, ‘কয়েক ঘণ্টা বৃষ্টি হলেই ইউনিয়নের বেশির ভাগ এলাকা পানিতে ডুবে থাকছে। এই রেলপথের বড় একটা অংশ আমার এলাকায় পড়েছে। উঁচু রেলপথের কারণে বৃষ্টি ও বানের পানি ভাটির দিকে নামতে পারছে না। এই রেলপথ পুরোপুরি বাস্তবায়নের আগেই সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধান করা উচিত। এ নিয়ে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে লিখিতভাবে জানানো হবে।’

নির্মাণাধীন রেলপথের কারণে চকরিয়ায় বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে—এমনটা মানতে রাজি নন প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, শুধু সামান্য বৃষ্টি নয়, ওই অঞ্চলে সাইক্লোনের আঘাত আসতে পারে—এমন ভাবনা মাথায় রেখেই রেলপথের নকশা তৈরি করা হয়েছে। আগামী ৫০ বছরে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কেমন হবে, তা-ও ভাবনায় ছিল নকশা প্রণয়নের আগে।
বিষয়টি নিয়ে নির্মাণাধীন রেলপথের প্রকল্প পরিচালক মো. মফিজুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ওই অঞ্চল তুলনামূলক নিচু, এটা জেনেই কাজ করা হচ্ছে। ফলে রেলপথের জন্য পানি আটকে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে এমনটা বলার সুযোগ নেই। এমন নয় যে বাঁধের এক পাশে পানি আর অন্য পাশ শুকনা। এখানে এই মুহূর্তে বাঁধ না থাকলেও পানি আটকে থাকত। প্রয়োজনীয় কালভার্ট তৈরি হচ্ছে। নকশা অনুযায়ী অল্প কিছু বাকি আছে, যা সময়মতো তৈরি হয়ে যাবে। স্থানীয় জলাশয় কম থাকাসহ অন্য কারণে পানি আটকে থাকতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘আমি নিজে পুরো এলাকা ঘুরে দেখেছি। আমি স্পষ্ট করে বলছি, রেলপথের জন্য পানি আটকে থাকছে না।’

যদিও আগামী বর্ষার আগে স্থানীয় পর্যায়ে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ শামসুল তাবরীজ। বাঁধের কারণে পানি আটকে যাচ্ছে—এমনটা পরিষ্কার করে বলছেন না তিনি। তবে আগামী বর্ষার আগে রেললাইনের তলদেশে এলাকাভিত্তিক ছোট ছোট কালভার্ট নির্মাণের ওপর জোর দেন তিনি। শামসুল তাবরীজ বলেন, ‘পানি আটকে থাকার জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা নির্মাণাধীন রেলপথকে দায়ী করছেন। বৃষ্টি বা বানের পানি নামতে যেন কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না হয় সে জন্য সমস্যা চিহ্নিত করে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে বসে করণীয় নির্ধারণ করা হবে। প্রয়োজনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হবে।’

উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও কক্সবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য জাফর আলম বলছেন, স্বপ্নের এই রেলপথ হতে হবে সুপরিকল্পিত। রেললাইনের কারণে বর্ষায় যাতে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত না হয় তা খেয়াল রাখতে হবে। তিনি বলেন, ‘যেহেতু রেললাইন নির্মাণের কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি। তাই কোথায় কী সমস্যা, তা চিহ্নিত করার এখনো সুযোগ আছে।’

২০১০ সালের ৬ জুলাই অনুমোদন পাওয়া এই রেলপথের ভৌত অবকাঠামোর কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের মার্চে। এই রেলপথের বাস্তব কাজের অগ্রগতি হয়েছে ৬১ শতাংশ। পুরো রেলপথে মোট ৩৯টি বড় সেতু এবং ১৪৫টি ছোট সেতু ও কালভার্ট তৈরি করা হবে। নির্মাণ করা হবে ৯টি নতুন রেলস্টেশন। আগামী বছরের জুনে এই পথে ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে রেলপথ মন্ত্রণালয়।

সূত্রঃ কালেরকণ্ঠ




Share via
Copy link
Powered by Social Snap