কক্সবাজার রাত ৩:৫১ ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১ | ১৪ আশ্বিন, ১৪২৮

উপহারের ঘর: ফুলের বাগানে সাপ

কামরুল আহসানঃ
বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে গৃহহীন মানুষদের ঘর উপহার দেয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। নিঃসন্দেহে এটি ছিল মুজিববর্ষের সবচেয়ে ভালো উদ্যোগ। প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছেন এটি মুজিববর্ষের সবচেয়ে বড় উৎসব। জাতির পিতারও স্বপ্ন ছিল সবাই যেন খাদ্য পায়, বস্ত্র পায়, শিক্ষা পায়, চিকিৎসা পায়, গৃহ পায়। মানুষের পাঁচটি অধিকারের বিষয়ে বঙ্গবন্ধু সারাজীবন সোচ্চার ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন সফল করার উদ্দেশ্যেই প্রধানমন্ত্রী দেশের গৃহহীন ও ভূমিহীনদের জমিসহ ঘর উপহার দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

ইতোমধ্যে ৮ লাখ ৮৬ হাজার ৬২২টি পরিবারের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। সবচেয়ে আনন্দের বিষয় মাত্র এক বছরের মধ্যে ১ লাখ ১৮ হাজার ৩৮০টি পরিবারকে ঘর উপহার দেয়া হয়েছে। টেলিভিশনে কিছুদিন আগে আমরা দেখেছি ঘর উপহার পেয়ে গৃহহীন মানুষদের আত্মহারা আনন্দ! নিজের একটা ঘর হবে তারা কোনোদিন কল্পনাও করেননি। অনেকের দিন কেটেছে পথে-ঘাটে, বস্তিতে। ঘরের চেয়ে বড় স্বপ্ন তাদের জীবনে আর কী থাকে? ঘর মানে আশ্রয়, মাথার ওপর চাল, ঝড়-বৃষ্টিতে নিরাপদ ঠাঁই। তাদের সেই স্বপ্ন আজ প্রধানমন্ত্রীর মহতী উদ্যোগে পূরণ হয়েছে।

কিন্তু দুঃখজনক হলো, সেই স্বপ্ন তাসের ঘরের মতো ভেঙেও পড়ছে। গণমাধ্যমে এ সংক্রান্ত খবর আমরা পাচ্ছি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভেসে বেড়াচ্ছে ভাঙা ঘরের ছবি। কোথাও ঘরের দেয়াল ধ্বসে গেছে, পলেস্তারা খসে পড়েছে, মেঝে বসে গেছে- কোথাও ঘরের ভেতর বৃষ্টির পানি ইত্যাদি। সরকারের বিরুদ্ধে প্রচারের সুযোগ পেলে বিরোধীপক্ষ কখনও বসে থাকে না। ফলে খবর ছড়িয়ে পড়ে বায়ু বেগে। এই ফেইসবুকের জামনায়, মানুষ কিছু একটা পেলেই হলো- মুহূর্তেই ভাইরাল! আসলেই কী ঘটেছে, কতোটুকু ঘটেছে, কার কারণে ঘটেছে, কেন ঘটেছে, এতে ভালো-মন্দ কী ফল হলো, ভবিষ্যতেই-বা কী হবে- এসব তলিয়ে দেখারও ফুরসত পায় না মানুষ।

কতোগুলো ঘর বিনষ্ট হয়েছে তার সঠিক সংখ্যা এ-পর্যন্ত জানা যায়নি। প্রাথমিক তদন্তে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে জানা গেছে, এ পর্যন্ত ২২ জেলার ২৬ উপজেলায় মোট ৩০০ ঘরের বিষয়ে এমন অভিযোগ এসেছে যে- ঘরগুলো বসবাসযোগ্য নয়। অভিযোগ অবশ্যই যুক্তিসংগত, তৈরি করতে না করতেই ঘরগুলো কেন এভাবে ভেঙে পড়ল? তদন্তে জানা গেছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের গাফিলতি, অনিয়ম, দুর্নীতির কারণেই এহেন দুর্যোগ। গৃহনির্মাণের জন্য প্রত্যেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) ওপর নির্দেশ ছিল পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠনের। বরগুনা উপজেলার ইউএনও মো. আসাদুজ্জামান কোনো সভা না করে কাগজে-কলমে একটি বানোয়াট কমিটি দেখিয়ে গোপনে সব কাজ একাই করতেন। এহেন অভিযোগে আসাদুজ্জামানসহ আরো চার ইউএনওকে এরই মধ্যে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। পত্রিকায় পড়েছি সেই খবর। কয়েকজনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছে। আরো কয়েকজন কর্মকর্তা শাস্তির মুখোমুখি হতে পারেন বলে জানা গেছে। স্বয়ং সরকারের পক্ষ থেকেই এদের বিরুদ্ধে কঠিন শাস্তির দাবি উঠেছে। এই দাবি অত্যন্ত যু্ক্তিসঙ্গত বলে মনে করি। কারণ এদের দুর্নীতি, অবহেলার কারণেই সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। সমালোচিত হচ্ছে একটি মহৎ উদ্যোগ।

আজ (৯ জুন) এটিএন নিউজে দেখালো প্রধানমন্ত্রীর উপহার দেয়া ঘরে হাঁটুপানি। যারা ঘরে উঠেছিলেন তারা ঘর ছেড়ে চলে গেছেন। সাধারণ বৃষ্টির পানিতেই এই অবস্থা, বন্যা হলে কী অবস্থা হবে ভেবে তারা আতঙ্কিত। ঘরগুলো একদম নদীর কিনারে। বিলের মধ্যে। যেসব ঘর ভেঙে পড়েছে সেগুলো বেশির ভাগই এমন খাস জমিতে। নরম মাটিতে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, ভালো করে খোঁজখবর নেয়ারও প্রয়োজন মনে করেননি কর্মকর্তারা। যে কারণে পুরো প্রকল্প আজ প্রশ্নের সম্মুখীন। তবে কয়েকটি ঘর ভেঙে পড়েছে বলে পুরো প্রকল্প ব্যর্থ হয়েছে এমন মনে করার কোনো কারণ নেই। অনেকে এমনভাবে খবরটি প্রচার করছেন যেন সব ঘরই ধ্বসে পড়েছে। এখনো লক্ষাধিক মানুষ বিভিন্ন জেলায় উপহার পাওয়া এ রকম নিজস্ব গৃহে বসবাস করছেন। তাছাড়া নষ্ট হওয়া ঘরগুলো শীঘ্রই ঠিক করে পুনরায় গৃহহীন মানুষদের বুঝিয়ে দেয়া হবে বলেও জানা গেছে।

তারপরও কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। এমন একটি মহৎ উদ্দেশ্যকে বানচাল করে দেয়ার অপচেষ্টা করা হচ্ছে না তো? যদি এমন হয় তাহলে দ্রুত তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হোক। তাদের উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক। অন্তত প্রশাসনে এমন কোনো ব্যক্তি যেন না থাকে- এটাই কামনা। বলতে দ্বিধা নেই, সরকারের জন্য এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছেন এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারাই। যে কারণে এই করোনাকালে আমরা দেখলাম চিকিৎক্ষেত্রে সীমাহীন অনিয়ম। বাজারব্যবস্থার কথা না বলাই ভালো। যে কোনো মুহূর্তে যে কোনো পণ্যের মূল্য বেড়ে যাচ্ছে। মোট কথা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সুযোগ-সন্ধানীদের ভিড়। এ রকম এক আদর্শহীন, অরাজক সমাজব্যবস্থায় যে-কেউ কোনো একটা সুযোগ নিয়ে বাড়তি অর্থকড়ি কামাতে চাইবেন সেটাই স্বাভাবিক আজ।

ভাবতে অবাক লাগে, এমন একটি ভয়ঙ্কর বৈশ্বিক মহামারিও আমাদের কিছু শিক্ষা দিতে পারল না। লোভের লাগাম টেনে না ধরে আমরা যেন আরো আত্মকেন্দ্রিক, স্বার্থপর হয়ে উঠছি। অথচ সামগ্রিক সমাজব্যবস্থা ঠিক না থাকলে কেউ-ই রাষ্ট্রের সুফল পাবে না। এ কথার সাম্প্রতিক উদাহরণ প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ঘর উপহার। প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছা ছিল। দেশের প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা প্রশ্নাতীত। এ-দেশ যে তাঁর পিতার হাতে গড়া। পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়নেই তিনি যাত্রা করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর এ উদ্যোগে দেশের প্রতিটি মানুষ সাধুবাদ জানিয়েছেন। আজ দু’চারজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার কারণে, তাদের অবহেলায় পুরো কাজটি যেন ব্যর্থ না হয়- সেদিকে লক্ষ্য রাখা সমাজের মানুষেরও দায়িত্ব।

মনে রাখতে হবে, নিরাপদ গৃহের সঙ্গে মানুষের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জড়িত থাকে। ভাসমান মানুষের কোনো কিছুরই নিশ্চয়তা নেই। লক্ষ লক্ষ মানুষ যে গৃহহীন মানবেতর জীবন-যাপন করছেন এটা আমাদের সভ্যতাকেই লজ্জার মধ্যে ফেলছে। তাই এমন একটি সাধু উদ্যোগের মধ্যেও যারা দুর্নীতির সুযোগ খুঁজেছেন তারা আসলে ফুলের বাগানে সাপ। এদের চিহ্নিত করে নিশ্চিহ্ন করা আজ সময়ের দাবি।

সূত্রঃ রাইজিং বিডি




Share via
Copy link
Powered by Social Snap