কক্সবাজার রাত ৪:৩১ ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১ | ১৪ আশ্বিন, ১৪২৮

আগুনে আর কত প্রাণ যাবে?

ইমরান হুসাইনঃ

আগুন লাগা, আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া এটি আমাদের কাছে কোন নতুন ঘটনা নয়। আমাদের দেশে এটি যেনো একটা স্বাভাবিক ঘটনা হিসাবে দাঁড়িয়েছে। কারণ প্রতিনিয়তই দেশে কোথাও না কোথাও এরুপ ঘটনা ঘটছেই। এতে জীবন্ত পুড়ছে কারো আপনজন আবার কারো সাজানো স্বপ্ন। আগুনে পুড়ে নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ কিন্তু তারপরও আমরা এই আগুন লাগার কোন কমতি দেখি না। একেরপর এক আগুনের ঘটনা ঘটলেও আমরা কোন সচেতনতা বা সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ দেখি না যেকারণে এ ঘটনা একেরপর এক ঘটেই চলেছে। করোনার এই মহামারি সময়ে আগুনে পুড়ে মারা যাওয়ার ঘটনা অত্যন্ত মর্মান্তিক।

আগুনে দগ্ধ হওয়া,রাসায়নিক গুদামে আগুন লাগা, ভবনে আগুন লাগা,বস্তিতে আগুন লাগা, ভবনে বা ফ্যাক্টরিতে আগুন লাগা যেনো এক নৈমিত্তিক ঘটনা। সম্প্রতি নারায়ণঞ্জের রুপগঞ্জে বৃহস্পতিবার বিকালে সেজান জুস কারখানায় আগুন লাগে। আগুন নিয়ন্ত্রণে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও ডেমরা ফায়ার সার্ভিসের ১৮টি ইউনিট কাজ শুরু করে। শুক্রবার ভোরের দিকে আগুন প্রায় নিয়ন্ত্রণে এসেছিল। কিন্তু সকালে ভেতরে আবার আগুন বেড়ে যায়। সকাল সোয়া ১০টার দিকেও ছয় তলা কারখানা ভবনের পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলার সামনের দিকে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। প্রতিবেদনে যানা যায়, প্রথম দিকে আগুনে পুড়ে তিনজনের মৃত্যুর খবর জানায় ফায়ার সার্ভিস। এ ঘটনায় আহত হন অর্ধশতাধিক শ্রমিক। এর মধ্যে ১০ জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

কারখানার আগুন থেকে বাঁচতে ভবনের ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়েন অনেকে। অনেকে ভেতরে আটকা পড়েন। তবে সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী এখনও আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয় নি এবং এতে এখনও পর্যন্ত ৫২ জন মারা গেছেন এবং ভিতরে আরো অর্ধশত আটক আছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে । কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে ফায়ার সার্ভিস বলছে এই ভবন পুরোটাই অপরিকল্পিত ভাবে নির্মিত এবং এখানে আগুন নেভানোর কোন সরঞ্জাম ছিল না। অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ এবং আগুন নেভানোর সরঞ্জাম না থাকা এটা মূলত কোন কোন দুর্ঘটনার নয়, এটা সম্পূর্ণই গাফিলতি বলা যায়। এবং সব থেকে বড় উদ্বেগজনক ঘটনা হলো ওই ভবনের ৫ম তলায় ছিল রাসায়নিক গুদাম। যেখানে আগুন লাগার পর পুরো ভবনে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

এর কিছু দিন আগে রাজধানীর পুরান ঢাকার আরমানিটোলায় হাজী মুসা ম্যানশন নামে একটি ছয়তলা ভবনের নিচতলায় কেমিক্যাল গোডাউনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ১৫টি ইউনিট কাজ করে। টানা তিন ঘন্টা পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু এতেও প্রান যায় অনেকের। এই আগুনের সূত্রপাত ছিলো রাসায়নিক গুদাম থেকে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো যেখানেই রাসায়নিক গুদাম সেখানেই আবাসিক। আর এরুপ চিত্র পুরান ঢাকাতে সব থেকে বেশি। পুরান ঢাকায় রাসায়নিক গুদামে আগুন লাগার ঘটনা আমাদের কাছে নতুন না কিন্তু তারপরও সংশ্লিষ্টসের মধ্যে কোন সচেতনতা বা কোন পদক্ষেপ চোখে পড়ে না ফলে এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে নানা ভাবে। আমরা যদি এর একটু আগের চিত্র দেখি তাহলে দেখতে পাই যে, পুরান ঢাকায় রাসায়নিক গুদামে দুই বড় অগ্নিকাণ্ডের একটি নিমতলীর আগুন। ২০১০ সালের ৩ জুন রাতের সেই ঘটনায় ১২৪ জনের মৃত্যু হয়। ঠিক এর ৯ বছর পর ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি চকবাজারের চুড়িহাট্টার ওয়াহেদ ম্যানশন নামের একটি ভবনে আগুনে মারা যান ৭১ জন।কিন্তু এরপরেও আমরা এই রাসায়নিক গুদাম সরানোর বা সুনির্দিষ্ট কোন পদক্ষেপ বা এর সাথে জড়িতদের শাস্তির কোন নজির চোখে পড়ে না। যখনই কোন দুর্ঘটনা ঘটে ঠিক তখনই আমাদের টনক নড়ে। কিছুদিন যাবৎ এ বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা এবং অনুসন্ধান ব্যবস্থা করা হয় তারপর আবার সব কিছু স্বাভাবিক হয়ে যায়।এভাবেই চলছে।

এখানেই শেষ নয় আমরা একটু খেয়াল করলেই দেখতে পাই রাসায়নিক গুদামে আগুন লাগাসহ আমাদের দেশে সম্প্রতি কতগুলো অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। একটা আগুনের শিখা নিভতে না নিভতেই সামনে আসে আরেকটা আগুনের শিখা। এবং সেগুলোর ভয়াবহতা কি পরিমান তা সহজেই অনুমান করতে পারি। গত বছরের একটা পরিসংখ্যানে দেখা যায় ঢাকায় ১২ মাসে ৩১ বস্তিতে আগুন। যা রীতিমতো আশ্চর্যজনক ঘটনা কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও এটাই সত্য। সর্বশেষ পল্লবীর তালতলা বস্তির আগুন যেখানে বস্তিবাসী আগুবের লেলিহান শিখা নিজ চোখে দেখেছে এবং চরম নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছে। এই তো সেদিনের কথা ২৩ শে নভেম্বর মধ্যরাতে আগুন লাগে মহাখালীর সাততলা বস্তি তে তাতে পুড়ে যায় কয়েকশ ঘর। মহাখালীর সাততলা বস্তিতে ৫ বছরে ৬ বার আগুন লাগে।

আমরা জানি যে রাজধানীর পুরান ঢাকা অন্যান্য নগরীর থেকে অনেক বেশি ঘনবসতিপূর্ণ। নানা রকম কলকারখানা আর রাসায়নিক গুদামে আচ্ছন্ন এই পুরান ঢাকা। তারমধ্যে জনসমাগমের প্রভাবও অনেক বেশি। ঠিক এমনই একটা শিল্প ও কলকারখানা সমৃদ্ধ এলাকা নারায়ণগঞ্জ। সেখানেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। আগুনের লেলিহান শিক্ষায় পুড়ে যে এতগুলো মানুষ মারা গেলো এটা সত্যিই দুঃখজনক ঘটনা। একটা তরতাজা মানুষ কিভাবে আগুনে পুড়ে মারা যায় সত্যি ভাবতেই গা শিহরে উঠে।

একেরপর এক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলেও এর সমাধানে আমরা কোন সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ দেখি না। অগ্নিকাণ্ডের এ হতাহতের সমাধানে সরকারকে আরো সচেতন হতে হবে। দুর্ঘটনার পিছনের কারণ অনুসন্ধান করে তা সমাধানের উপায় বের করতে হবে। নতুবা অগ্নিকাণ্ডের এরুপ ঘটনা অনবরত চলতেই থাকবে। যখন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটবে তখন আমরা একটু নড়েচড়ে বসবো পরে ঠিক কিছুদিন পর আবার ঝিমিয়ে যাবো। যখন কোন একটা দুর্ঘটনা ঘটে তখন আমরা দেখতে পাই লাশ প্রতি তার পরিবারের কিছু টাকা ঘোষণা করা হয় আসলে এটা কোন সমাধান হতে পারে না। এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে চাই আইনের কঠোরতা ও জনসচেতনতা।

দুর্ঘটনা এড়াতে আমাদের সকলকেই অধিক সচেতন হতে হবে। প্রত্যেক ভবনেই আগুন নির্বাপণ ব্যবস্থা ও ভবন থেকে বের হওয়ার বিকল্প পথ নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে দুর্ঘটনাবশত আগুন লাগলেও তা নিয়ন্ত্রণ ও ভবন থেকে বের হওয়া সম্ভব হবে। সকলের সচেতনতা ছাড়া এই দুর্ঘটনা এড়ানো যাবে না। স্থানীয়রা যদি এ ব্যাপারে সচেতন না হোন কোন পদক্ষেপ না নেন তাহলে এর শেষ হবে না। সেই সাথে এরুপ ঘটনার সঠিক তদন্ত করে জড়িতদের শাস্তি দিতে হবে।

লেখক : শিক্ষার্থী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, সাংগঠনিক সম্পাদক বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।
imranhossain64.bd@gmail.com




Share via
Copy link
Powered by Social Snap